মাদকাসক্তি আজ আমাদের সমাজের এক ভয়াবহ ব্যাধি, যা তারুণ্যের শক্তি ও সম্ভাবনাকে গ্রাস করে দেশের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হওয়া সত্ত্বেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ মাদকের সর্বাত্মক আগ্রাসনের শিকার।
প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় মাদকের বিস্তার রোধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের প্রায় সাত দশমিক পাঁচ মিলিয়ন (৭৫ লক্ষ) মানুষ মাদকাসক্ত, যার ৯০ শতাংশই কিশোর, যুবক ও ছাত্র-ছাত্রী। এই চিত্র আমাদের জাতীয় উদ্বেগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভয়াবহতা ও সামাজিক প্রভাব মাদকের বিষাক্ত ছোবল শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য নয়, বরং পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থাকে ভেঙে দিচ্ছে। এটি পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক অস্থিরতা, এবং চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের মতো অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাদকাসক্তদের ৫০ শতাংশের বয়স ২৬ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে এবং তাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষিত। মাদক সেবনের ব্যয় মেটাতে তারা নানা রকম দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কার্যকলাপে লিপ্ত হচ্ছে, যা সমাজ জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা—সর্বত্রই মাদকের সহজলভ্যতা উদ্বেগজনক। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিণত হচ্ছে মাদকের স্বর্গরাজ্যে, যেখানে শিক্ষার্থীরা আতঙ্ক ও হতাশায় ভুগছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া মাদকমুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব নয়।
প্রতিরোধে জিরো টলারেন্সের ডাক
মাদকমুক্ত একটি উন্নত দেশ ও স্মার্ট সমাজ গঠনে 'জিরো টলারেন্স' নীতি কঠোরভাবে কার্যকর করার দাবি উঠেছে। এই নীতি জঙ্গিবাদের মতো মাদক নিয়ন্ত্রণেও প্রয়োগ করা প্রয়োজন। প্রশাসনের কঠোরতা: মাদকবিরোধী অভিযানে গতি এনে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ: সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে হবে এবং মাদক চোরাচালানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।
ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক: রাষ্ট্রীয় যেকোনো সেবা পেতে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার দাবি উঠেছে।
মাদক গডফাদারদের শাস্তি: মাদক নির্মূলে গডফাদারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং মাদকের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। সচেতনতাই মুক্তির পথ
এককভাবে সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এই ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পরিবার, সমাজ, এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ ও সামাজিক আন্দোলন।
পারিবারিক ভূমিকা: মা-বাবাকে তাদের সন্তানের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে এবং সুস্থ পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ: ধর্মীয় অনুশাসন অনুসরণ এবং মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টির মাধ্যমে যুব সমাজকে মাদকের অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে।
পুনর্বাসন ব্যবস্থা: মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী না ভেবে অসুস্থ হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং তাদের জন্য সঠিক চিকিৎসা ও আন্তরিক পুনর্বাসন ব্যবস্থার প্রসার ঘটাতে হবে। সরকারি-বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলোর মান ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
"মাদক ছাড়ুন, চা ধরুন"-এর মতো স্লোগান নিয়ে চায়ের দোকানির অভিনব উদ্যোগের মতো সারাদেশে সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিবাদের ঢেউ ছড়িয়ে দিতে হবে। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে মাদকের বিরুদ্ধে এই সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে।
মোঃ ফয়েজ উদ্দিন